ভ্যালেন্টাইন্স কেনো বিশ্ব ভালবাসার প্রতিক হবে ???

ভ্যালেন্টাইন্স কেনো বিশ্ব ভালবাসার প্রতিক হবে? একজনের মৃত্যু দিবসে কেন হবে বেহায়াপনা! রুখবে কে এই অপসংস্কৃতি ?


    -আলহাজ্ব মোঃ সাদিকুর রহমান বকুল

সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ইতালির রোম নগরীতে জন্ম গ্রহণ করেন। চিরকুমার এই মহান
চিকিৎসক এক সময় তথা ২৬৯ খৃষ্টাব্দে রোমের এক ক্যাথলিক গীর্জায় পাদ্রী
হিসেবে যোগদান করেন। ঐ সময় ইতালিতে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার ছিল সম্পূর্ণ
নিষিদ্ধ। এ সত্বেয় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ধর্ম প্রচারে নিজেকে নিবিষ্ট করলে
তৎকালীন সম্রাট ক্লডিয়াস তার উপর ক্ষুব্ধ হন এবং তা থেকে বিরত রাখার জন্য
ভ্যালেন্টাইন্সকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। কারাগারে যেয়ে তিনি জানতে পারেন
জেলার সাহেবের একমাত্র সাবালিকা মেয়ে জুলিয়াস অন্ধ হয়ে গেছেন।
ভ্যালেন্টাইন্স জুলিয়াসকে চিকিৎসা দিয়ে ভাল করে তোলেন তার চোখ দুটো।
কারাগারের ভিতরে বাসা হওয়ায় জুলিয়াস আলাপচারিতা, খাওয়া-দাওয়া করানো সহ খোঁজ
খবর রাখতে রাখতে এক সময় জুলিয়াস ভ্যালেন্টাইন্স এর প্রেমে পড়ে যায় এবং
বিয়ের প্রস্তাব দেয়। ভ্যেলেন্টাইন্স জুলিয়াস কে বোঝায় পাদ্রীরা কখনও বিয়ে
করেনা। তাই আমিও তোমাকে বিয়ে করতে পারব না। জুলিয়াসের প্রেম নিবেদনের খবর
সম্রাটের কানে পৌছালে সম্রাট ভ্যলেন্টাইন্সকে আলাদা সেলে রাখেন। একদিন
জুলিয়াস প্রেম নিবেদন করে একটি চিরকুট ভ্যালেন্টাইন্স এর সেলে পাঠিয়ে দেয়।
ভ্যালেন্টাইন্স ঐ চিরকুটেই জবাব লিখে সেলের ভেন্টিলেটার দিয়ে বাইরে ফেলে
দেন। ঐ চিরকুট দুর্ভাগ্যক্রমে সম্রাটের হাতে পড়ে যায় কারো মারফত। এতে
সম্রাট আরো বেশী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং অতি দ্রুত ভ্যালেন্টাইন্সকে শুলে
চড়িয়ে মৃত্যু কার্য্যকর করেন ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনায়
ভ্যালেন্টাইন্স এর শিষ্যরা গোপনে চোখের জল ঝরিয়েছেন তবে কেউ প্রতিবাদ করতে
পারেন নি। কালের বিবর্তনে দীর্ঘ কাল-পরিক্রমায় ২২৭ বছর পরে খৃষ্ঠান ধর্মের
প্রসার ঘটলে ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিও প্রথম জুলিয়াস-ভ্যালেন্টাইন্স
স্মরণে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে তথা ভ্যালেন্টাইন্সের মৃত্যু
দিবস হিসেবে ঘোষনা দিয়ে দিনটি সর্ব প্রথম উদযাপন করেন। ক্যাথলিক ধর্মের
প্রসার ঘটলে অষ্টদশ শতাব্দি থেকে নিয়মিত দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাব
গাম্ভির্য্যের সাথে ক্যাথলিক ধর্মানুসারিরা ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে বিশেষ
প্রার্থনা করে এবং খৃষ্টান ধর্মের রীতি অনুযায়ী ভ্যালেন্টাইন্স এর কবরে
পুস্পস্তবক অর্পন করে থাকে। ভ্যালেন্টাইন্স কখনও প্রেমিক ছিলেন না এবং
জুলিয়াসকে কখনও ভালবাসতেন না। অথচ খৃষ্টান ধর্মানুসারীদের একজন ধর্মযাজকের
মৃত্যু দিবসকে আমাদের দেশের লোকেদের মধ্যে চরম ভাবে প্রবেশ ঘটেছে
ভ্যালেন্টাইন্সের মৃত্যু দিবসটি ভালবাসার দিবস হিসেবে। আমাদের দেশে এ দিবসে
একে অপরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। অথচ এ দিবসটিতে খৃষ্ঠান ধর্মানুসারিরা
ভ্যালেন্টাইন্সের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রাদ্ধা জানানোর জন্য তার কবরে ফুল
দিয়ে থাকে। ভ্যালেন্টাইন্স ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। ধর্ম প্রচারের কারনে
তাকে হত্যা করা হয়। ঈশা (আঃ) কেও হত্যা করার জন্য ক্রুশে বিদ্ধ করা হয় ধর্ম
প্রচারের কারণে। তা হলে ঈশা (আঃ) এর মৃত্যু দিবস টিকে ভালবাসা দিবস হিসেবে
কেন উদযাপন করা হয় না ? ২৫ ডিসেম্বর দিবসটিকে বড় দিন হিসেবে মান্য করা হয়।
ইশা (আঃ) এর মৃত্যু দিবসটিকে খৃষ্টানধর্মীরা দিব্যি বিশ্ব ভালবাসা দিবস
হিসেবে উদযাপন করতে পারত। কেনো করে না ? ঈশা (আঃ) কে তো অনেকেই ভালবাসত।
আমাদের সামাজে না বুঝে গুজবে কান দিয়ে মেতে ওঠে বিশ্ব ভালবাসা দিবসে এক
শ্রেণীর অজ্ঞ লোকেরা। একজন মুসলিম হয়ে সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই প্রিয়জনকে
জানায় হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে। কি ভাবে দিনটি হ্যাপি হলো আর কেনইবা একজন
মুসলমান একথা বলে শুভেচ্ছা জানায় তা আজও বুঝে উঠতে পারিনি। আমাদের দেশে
১৯৯১ সাল থেকে দিনটি উদযাপিত হয়ে আসছে বড় ধুমধামের সাথে। অনেকেই আবার
ভালমন্দ খেয়ে থাকেন এ দিনে। আল্লাহ্ নাম নিয়ে নেমে পড়ে ফুল কিনে বাহারি
সাজে সেজে। অপেক্ষা করতে থাকে আঁনাচে-কাঁনাচে, পার্কে-বাগানে, ঝোঁপে-ঝাড়ে।
প্রথমে ফুল বিনিময় তারপর প্রেমালাপ অবশেষে তা গড়ায় শারীরিক সম্পর্কে তারপর
কেল্লাফতে। রাতে নাইট ক্লাবগুলোতে বিশ্ব ভালবাসা দিবসের নামে মেতে উঠে
নেশা থেকে আদিম নেশায়। এই হলো আমাদের দেশে ভ্যালেন্টাইন্স ডে উদযাপনের হাল
হকিকত। আমেরিকান নাগরিক হেজেজ উচ্চ শিক্ষার্থে যান লন্ডনে। একই
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে ব্রিটিশ রাজ পরিবারের মেয়ে বেনসনের সাথে প্রণয়ে
জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে রাজতন্ত্র মোতাবেক প্রেমিক হেজেজের
মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় এবং জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। এ খবর চারিদিকে
ছড়িয়ে পড়লে বেনসন পালিয়ে এসে সেও আগুনে লাফ দিয়ে আত্মহুতি দেয়। একেই বলা হয়
প্রেম এবং প্রেমের পরিণতি। বেনসন এবং হেজেজের মৃত্যু দিবসটিকে বিশ্ব
ভালবাসা দিবস হিসেবে ঘোষনা দিলে মন্দ হত না। অবশেষে তাদের স্মৃতিকে ধরে
রাখার জন্য ব্রিটিশ টোবাকো কোম্পানী “বেনসন এন্ড হেজেজ” নামে সিগারেট বের
করে। অন্য দিকে পাক ভারত উপমহাদেশই শুধু নয় সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা
সকল সিনেমাপ্রেমী দর্শক উত্তম-সূচীত্রাকে প্রেমের মডেল মনে করত। ১৯৮০ সালে
২৪ জুলাই হঠাৎ করে উত্তম কুমার মৃত্যুবরণ করলে সূচীত্রা সেন বলেন “জুটি
চলে গেলেন অসময়ে তাহলে আমি কেন থাকব পর্দাতে” ? এমন চেতনা থেকে সহশিল্পীর
প্রতি প্রেম, শ্রদ্ধা, ভালবাসার কারণে আমৃত্যু সূচীত্রা সেন আর কখনও ছবিও
করেননি এবং জনসমক্ষেও আসেননি। জনশ্রুতি আছে একের পর এক হৃদয় ছোঁয়া
রোমান্টিক ছবি করতে করতে মনের অজান্তেই দুজন দুজনকে গভীরভাবে ভালবেসে
ফেলেন। প্রেমিকের এমন আকষ্মিক বিদায়ে চরমভাবে আহত হন সূচীত্রা সেন। মৃত্যুর
আগ পর্যন্ত কোন পুরুষের সামনে আসেননি এবং কোন পুরুষের সাথে কথাও বলেননি।
একেই বলে প্রেম। সূচীত্রা সেনের এমন নীরব প্রেমের উৎসর্গকে তথা ২৪ জুলাই
তারিখটিকে বিশ্বভালবাসা দিবস ঘোষনা দিলে মনে হয় তা যথার্তই হতো।  অন্য দিকে
হযরত ইউসুফ আঃ কে পাওয়ার মানসে জুলেখা বেগম যে শেষ চেষ্টা করেছিলেন যে
দিনটিতে সেই দিনটিকেও আমরা বিশ্ব ভালবাসা দিবস হিসেবে পালন করতে পারি। এ
ছাড়া হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) প্রতিনিয়ত ভালবাসার যে সহস্র নিদর্শন রেখে গেছেন
তার একটি দিনকেও যদি বিশ্ব ভালবাসা দিবস হিসেবে আমরা উদযাপন করতাম তাহলে
মুসলমান হিসেবে আমাদের জীবন হয়ে উঠত আরো সুন্দর জীবনমুখী। কিন্তু সেদিকে
আমাদের  কারো কোন দৃষ্টি নেই, ভ্রুক্ষেপ নেই। আছে বিজাতীয় সংস্কৃতি নিয়ে
দড়ি টানাটানি। জানিনা বিজাতীয় সংস্কৃতির ভয়ংকর ভুত আমাদের ঘাড় থেকে নামবে
কবে। কবে হব আমরা অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত। রুখবে কে এই অপসংস্কৃতি??

নতুনখবর.কম